সংক্রামক রোগ কাকে বলে?
ক্ষতিকর জীবাণু এবং তাদের উৎপাদিত বিষাক্ত পদার্থ, বিভিন্ন বাহকের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেসকল অসুস্থ অবস্থা তৈরি হয় তাদেরকে সংক্রামক রোগ বলা হয়।
অর্থাৎ, সংক্রামক রোগ এমন এক ধরণের অসুস্থতা যেখানে ক্ষতিকারক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব বা জীবাণু আমাদের শরীরে প্রবেশ এবং বংশবিস্তার করে, যা পরবর্তীতে স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।
সংক্রামক রোগের কারণ কী?
ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া এবং হেলমিন্থ—সংক্রামক রোগের জন্য মূল ভূমিকা পালন করা প্রধান পাঁচ ধরণের জীব।
সংক্রামক রোগ কিভাবে ছড়ায়?
রোগ সৃষ্ঠিকারী জীবাণু সাধারণত মুখ, চোখ, নাক, মূত্র ও প্রজননতন্ত্রের উন্মুক্ত অংশ, ঘা, ত্বকভেদ করে সৃষ্ট ক্ষত ইত্যাদি স্থানের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। এদের ছড়িয়ে পড়ার কিছু সাধারণ উপায়:
স্পর্শ
রোগাক্রান্ত ত্বক, মিউকাস মেমব্রেন এবং শরীরের ক্ষতিকর তরল পদার্থ সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমে অন্য সুস্থ মানুষে ছড়াতে পারে। এমনকি রোগাক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ করা স্থান বা বস্তু যেমন: মুঠোফোন, বই-খাতা, কলম, দরজার হাতল ইত্যাদিতে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু থাকতে পারে। উদাহরণ: চিকেনপক্স, ডিপথেরিয়া, ইবোলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস, পোলিও, নোরোভাইরাস, টিটানাস, AIDS, HPV ।
বাতাস
বাতাসে ধুলাবালি ও জলকণার মাধ্যমে রোগ ছড়াতে পারে। হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ছড়াতে পারে। উদাহরণ: হাম, যক্ষ্মা (টিবি), ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া, পোলিও, হুপিং কফ, Hib, SARS।
বাহক
মশা, মাছি, শামুক, ইদুঁর, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক রোগ ছড়াতে পারে। যেমন: ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা, জলাতংক (রেবিস)।
অন্যান্য মাধ্যম
ক্ষতিকর জীবাণু এবং তাদের উৎপাদিত বিষাক্ত পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য, পানি, রক্ত এবং অন্যান্য বস্তুর মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। যেমন: ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, নোরোভাইরাস, AIDS।
সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের অপরিহার্য ১০টি উপায়
আধুনিক সভ্যতা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের দ্রুত উন্নতির সাথে সাথে, আমরা রোগ নির্নয় ও চিকিৎসায় অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছি। তবুও গোটা দুনিয়ায়, সংক্রামক রোগ আধুনিক সমাজে এখনো বড় হুমকি হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। সুতরাং প্রতিরোধের দিকে আমাদের বিশেষ গুরত্ব দিয়ে সংক্রামক রোগ মোকাবেলা করাই সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ। আসুন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের ১০টি অপরিহার্য উপায় সর্ম্পকে জানি।
- টিকা সময়মতো নিন। সঠিক নিয়ম অনুযায়ী টিকা গ্রহণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় থাকে।
- সঠিক ভাবে হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন। সাধারণ সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে, ভালোভাবে শুকানো হাত রোগ প্রতিরোধের খুব কার্যকর একটা উপায়। অতিরিক্ত অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ব্যবহার না করাই উত্তম।
- খাবার সাবধানে প্রস্তুত করা ও যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করুন। রান্নার আগে ও পরে হাত ধুয়ে নিন, সকল উপকরণ ও কাঁচামাল পরিষ্কার করে নিন, খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করুন।
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক (শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে) ব্যবহার করুন। যেনে রাখা ভালো, ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
- ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন। সংক্রমণ দ্রুত খারাপ হলে বা অ্যান্টিবায়োটিকের পরও ভালো না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- বন্য বা অচেনা প্রাণী থেকে সাবধান থাকুন। কোন প্রাণীর মাধ্যমে কামড় বা আঁচড় প্রাপ্ত হলে, তৎক্ষণাত ক্ষত স্থান সাবান ও পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনিও চিকিৎসা নিন।
- পোকামাকড়ের কামড় এড়িয়ে চলুন।
- নিরাপদ যৌনচর্চা করুন। অজানা সঙ্গীর সঙ্গে কন্ডোম ব্যবহার করুন এবং ঝুঁকি থাকলে যৌন সংক্রমণ পরীক্ষা করুন।
- ভ্রমণের সময় সতর্ক থাকুন। মারাত্মক কোন রোগের ঝুঁকি রয়েছে এমন দেশে ভ্রমন এড়িয়ে চলুন। একান্তই যাওয়ার প্রয়োজন থাকলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বা CDC এর মতো বিশ্বস্ত সূত্র থেকে দিকনির্দেশনা মূলক তথ্য নিন।
- স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখুন। ভালো খাবার খান, পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিন, নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং তামাক বা মাদক সবসময় পরিহার করুন ।
সংক্রামক রোগ বিশ্বব্যাপী একটি জটিল ও গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। যদিও কিছু রোগ, যেমন: স্মলপক্স (Smallpox) এবং পলিওমায়েলাইট (Poliomyelitis), প্রাকৃতিকভাবে নির্মূল হয়েছে বা প্রায় নির্মূলের পথে রয়েছে, অনেক রোগ আজও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং অনেক সময় এদের নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে যথেষ্ট আশার পথ দেখা যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নতুন সংক্রামক রোগের দেখা মিলছে পৃথিবীতে। আবার অনেক সময় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হিসেবে মনে করা বেশ কিছু রোগ হঠাৎই আবারও বিস্তার লাভ করছে। মার্কিন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH; Bethesda, MD, USA) অনুসারে, গত দুই দশকে ১৬টি নতুন সংক্রামক রোগ চিহ্নিত হয়েছে, এছাড়া আরও পাঁচটি রোগ নতুন রূপে পুনরায় উদীয়মান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখানে ‘নতুন’ শব্দটি মূলত রোগটির সম্প্রতি আবিষ্কৃত হওয়াকে নির্দেশ করে। অনেক Micororganism/অণুজীব পূর্বে non-pathogenic অর্থাৎ সাধারণ অণুজীব হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও সম্প্রতি তারা রোগজীবাণু (pathogenic) আকারে রূপান্তরিত হয়েছে।
অর্থাৎ সংক্রামক রোগ সর্ম্পকে আমাদের সবসময় সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।
